করোনা আতঙ্কের পাশাপাশি বর্তমানে দেশে ডেঙ্গুর উপদ্রব বেড়েছে। এছাড়া ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। কোভিড-১৯ এর মতো ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়াও সংক্রামক রোগ। ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া উভয় রোগই মশার কামড়ে ছড়ায়। কোভিড-১৯, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে উপসর্গ প্রকাশ পেয়ে থাকে এবং এসব উপসর্গের মধ্যে বেশ মিল রয়েছে।একারণে উপসর্গ দেখে কোভিড-১৯ নাকি ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়া হয়েছে তা ভেবে অনেকেই বিভ্রান্ত হতে পারেন। এছাড়া চিকিৎসকেরা একইসময়ে দুটি ভাইরাসে সংক্রমিত রোগীও পেয়েছেন, অর্থাৎ যার কোভিড-১৯ হয়েছে তার ডেঙ্গুও হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই তিনটি রোগের মধ্যে ঠিক কোনটা হয়েছে তা বুঝবেন কীভাবে?

* কোভিড-১৯, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া যেভাবে ছড়ায় কোভিড-১৯ হলো শ্বাসতন্ত্রীয় সংক্রমণ, যা সাধারণত সংক্রমিত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। কোভিড রোগীর কাশি-হাঁচির মাধ্যমে নির্গত তরলকণাতে সংক্রমণ সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস (সার্স-কভ-২ ভাইরাস) থাকে। এসব তরলকণা সুস্থ ব্যক্তির হাতের সংস্পর্শে আসলেও সংক্রমণটি ছড়াতে পারে, যদি তিনি সাবান-পানিতে হাত না ধুয়ে থাকেন বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার না করেন। অন্যদিকে, সংক্রমিত মশা কামড়ালে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া হয়। সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু হয় এবং সংক্রমিত অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া ছড়ায়।

* কোভিড-১৯, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার উপসর্গ কোভিড-১৯ ও ডেঙ্গু হলো ভাইরাস জনিত সংক্রমণ এবং ম্যালেরিয়া হলো প্যারাসাইট জনিত সংক্রমণ। এসব সংক্রমণে অনেক উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে। তিনটি সংক্রমণে যেসব উপসর্গের মিল পাওয়া গেছে তা হলো- জ্বর ও মাথাব্যথা। দুটি সংক্রমণের মধ্যে মিল খুঁজলে আরো সাদৃশ্যযুক্ত উপসর্গ পাওয়া যায়। কিছু রোগের মধ্যে উপসর্গগত মিল থাকলে উপসর্গ বিবেচনায় প্রকৃত রোগ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়। কোভিড-১৯, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া সবগুলো সংক্রমণই ভয়াবহ পরিণতির কারণ হতে পারে। তাই এসব সংক্রমণ সম্পর্কে যথাসম্ভব জ্ঞান রাখতে হবে। ডেঙ্গু ভাইরাসের চার ধরনের সেরোটাইপ দ্বারা এডিস মশা সংক্রমিত হলে এবং ওই মশা সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ালে ডেঙ্গু সংক্রমণ হয়ে থাকে। চার রকম সেরোটাইপ আছে বলে একজন মানুষ চারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। ডেঙ্গু রোগীর উল্লেখযোগ্য উপসর্গসমূহ হলো- উচ্চ মাত্রার জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, জয়েন্ট ব্যথা, পেশি ব্যথা, বমিভাব, পেট ব্যথা ও ডায়রিয়া। প্লাসমোডিয়াম নামক প্যারাসাইটে সংক্রমিত মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়।

সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু না করলে সংক্রমণটি প্রাণনাশক হতে পারে। ম্যালেরিয়ার উল্লেখযোগ্য উপসর্গসমূহ হলো- বিপজ্জনক জ্বর, শীতশীত ভাব, শরীরে কাঁপুনি, সারা শরীরে তীব্র ব্যথা, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, ঘেমে যাওয়া ও বিরলক্ষেত্রে খিঁচুনি। যাদের কোভিড-১৯ হয়েছে তাদের একটা অংশ মৃদু সংক্রমণ, আরেকটা অংশ পরিমিত সংক্রমণ এবং অনেকেই তীব্র সংক্রমণে ভুগেছেন। আবার অনেকেই বুঝতে পারেননি তারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ও মূল কোভিড-১৯ এর উপসর্গে কিছুটা তারতম্য দেখা গেছে। করোনার মূল সংক্রমণ ও নতুন ভ্যারিয়েন্ট পর্যালোচনায় দৃষ্ট উল্লেখযোগ্য উপসর্গসমূহ হলো- জ্বর, শীতশীত অনুভূতি, কাশি, গলা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, খুবই ক্লান্তি ও দুর্বলতা, ঘ্রাণশক্তি বিলোপ, সর্দি ও অন্যান্য।

* নির্দিষ্ট সংক্রমণ সম্পর্কে জোরালো ধারণার নির্দেশক যেহেতু এখানে আলোচিত সবগুলো সংক্রমণের মধ্যে উপসর্গগত অনেক সাদৃশ্যতা আছে, তাই কয়েকটি উপসর্গ দেখে নির্দিষ্ট সংক্রমণ হয়েছে ধারণা করলেও এটা সত্য যে মনের সন্দেহ দূর হবে না। তাই মনের খচখচানি দূর করতে অবশ্যই মেডিক্যাল টেস্টের প্রয়োজন আছে। তবে তিনটা সংক্রমণেই এমনকিছু উপসর্গ দেখা গেছে যা লক্ষ্য করলে কোনো একটা সংক্রমণের পক্ষে ধারণা স্পষ্ট হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ঘ্রাণশক্তি হারালে এই ধারণা জোরালো হয় যে কোভিড-১৯ হয়েছে। এই সংক্রমণে স্বাদও পরিবর্তন হতে পারে। ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়াতে স্বাদের স্বাভাবিকতা বা ঘ্রাণশক্তি হারায় না।কোভিড রোগী শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গে ভুগতে পারেন, যেমন- কাশতে পারেন ও গলায় ব্যথা/অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন।

এগুলো হলো করোনা সংক্রমণের প্রচলিত উপসর্গ। কারো কারো কণ্ঠস্বরে পরিবর্তনও আসতে পারে। সাধারণত ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়াতে এসব উপসর্গ দেখা যায় না। করোনার মূল সংক্রমণে বমিভাব ও ডায়রিয়ার প্রচলন তেমন ছিল না, কিন্তু নতুন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণে উপসর্গ দুটি উল্লেখযোগ্য হারে দেখা গেছে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও বমিভাব ও ডায়রিয়া হতে পারে। কিন্তু ম্যালেরিয়াতে উভয় উপসর্গের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। করোনা সংক্রমণে শ্বাসকষ্ট হতে পারে, বুকে ব্যথা করতে পারে ও অন্যান্য শ্বাসপ্রশ্বাস জনিত সমস্যা হতে পারে।কিন্তু ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়াতে এসবের আশঙ্কাও নেই বললেই চলে।

প্রায়ক্ষেত্রে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া শুরু হয় মাথাব্যথা বা দুর্বলতা দিয়ে, কিন্তু করোনায় সংক্রমিত হলে সবসময় এমনটা নাও হতে পারে। ডেঙ্গু রোগীর চোখের পেছনে ব্যথা করতে পারে ও ত্বকে র্যাশ ওঠতে পারে। গুরুতর ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে রোগীর নাক থেকে রক্ত পড়তে দেখা গেছে, এমনকি কালো পায়খানাও হতে পারে- এসব উপসর্গে অবশ্যই রোগীকে হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা করতে হবে। অন্যদিকে ম্যালেরিয়ার প্রধান লক্ষণ হলো, নির্দিষ্ট সময় পরপর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে ও ঘাম দিয়ে জ্বর কমে যায়।